বর্তমান বিশ্বে নারী স্বাধীনতা ও অধিকার নিয়ে যখন নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা বিদ্যমান, তখন ইসলামি শরীয়ত ‘পর্দা’ বা ‘হিজাব’-এর বিধানের মাধ্যমে না...
বর্তমান বিশ্বে নারী স্বাধীনতা ও অধিকার নিয়ে যখন নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা বিদ্যমান, তখন ইসলামি শরীয়ত ‘পর্দা’ বা ‘হিজাব’-এর বিধানের মাধ্যমে নারীকে দান করেছে এক অনন্য মর্যাদা ও নিরাপত্তা। ইসলামে পর্দা কেবল একটি বিশেষ পোশাকের নাম নয়, বরং এটি নারীর সম্মান রক্ষা এবং একটি কলুষমুক্ত সমাজ গঠনের ঐশী পথপদ্ধতি।
১. পবিত্র কোরআনের নির্দেশ: নারীর সুরক্ষায় পর্দার অনিবার্যতা
পর্দার বিধান কোনো মানুষের আবিষ্কৃত নিয়ম নয়, বরং এটি মহান আল্লাহ তাআলার সরাসরি আদেশ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মুমিন নারীদের পর্দার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ ۗ
অনুবাদ: "হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে, কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না।"
(সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৯)
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করেছেন যে, পর্দার মূল উদ্দেশ্য হলো নারীর নিরাপত্তা এবং তাকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করা, যাতে কোনো লম্পট বা দুশ্চরিত্র ব্যক্তি তাকে অসম্মান করার সাহস না পায়।
২. সহিহ হাদিসের আলোকে নারীর মর্যাদা ও পর্দা
রাসূলুল্লাহ (সা.) নারীর মর্যাদা রক্ষায় পর্দার গুরুত্বকে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। নারীর পুরো সত্ত্বাকেই ইসলামে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ এবং সতর বা আবৃত রাখার বিষয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন:
الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ، فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ
অনুবাদ: "নারী হলো আবৃত রাখার বস্তু। যখন সে (পর্দা ব্যতিরেকে) বের হয়, তখন শয়তান তার দিকে উঁকি মেরে দেখে (অর্থাৎ তাকে পাপে লিপ্ত করার বা তাকে দিয়ে ফিতনা ছড়ানোর সুযোগ খোঁজে)।"
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ১১৭৩; ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান সহিহ বলেছেন)
এছাড়াও সহিহ বুখারীতে আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, পর্দার আয়াত নাজিল হওয়ার পর আনসারী মহিলারা তাদের চাদর দিয়ে নিজেদের আবৃত করে ফেলেছিলেন, যা তাদের আনুগত্য ও তাকওয়ার বহিঃপ্রকাশ। (সহিহ বুখারী, হাদিস নম্বর: ৪৭৫৮)।
৩. প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম ও মুজতাহিদ ইমামদের অভিমত
পর্দার গুরুত্ব ও এর দার্শনিক দিক নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ওলামায়ে কেরাম ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ.) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
> "আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তিনি মুমিন নারীদের—বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের—চাদর দিয়ে নিজেদের শরীর আবৃত রাখতে বলেন। এটি তাদের আলাদা আভিজাত্য ও সতীত্বের পরিচয় দেবে এবং জাহেলি যুগের বেপর্দা নারীদের থেকে তাদের পৃথক করবে।"
> (সূত্র: তাফসিরে ইবনে কাসীর, সূরা আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)
ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে, নারীর হিজাব কেবল তার দেহ ঢাকা নয়, বরং এটি তার চারিত্রিক পবিত্রতার বহিঃপ্রকাশ এবং ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী হলো ‘মুক্তো’র মতো, যা আবরণে থাকলেই তার প্রকৃত মূল্য ও সৌন্দর্য সংরক্ষিত থাকে।
৪. সাংবাদিকীয় পর্যবেক্ষণ: পর্দার সামাজিক প্রভাব
একজন সাংবাদিক হিসেবে সমাজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে সমাজে পর্দার বিধান যথাযথভাবে পালিত হয়, সেখানে ইভটিজিং, ধর্ষণ ও চারিত্রিক অবক্ষয়ের হার তুলনামূলক অনেক কম। পর্দা নারীকে বন্দী করে না, বরং তাকে একটি নিরাপদ বলয় প্রদান করে যার ভেতর থেকে সে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সমাজসেবার মতো মহৎ কাজগুলো স্বচ্ছন্দে সম্পাদন করতে পারে।
ইসলামি আইনবিদদের মতে, পর্দা নারীর হীনম্মন্যতা নয়, বরং এটি তার ব্যক্তিত্বের ভূষণ। পর্দা বজায় রেখে একজন নারী যখন জনসমক্ষে আসেন, তখন মানুষ তার বাহ্যিক অবয়বের চেয়ে তার মেধা ও কর্মকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, পর্দা মুসলিম নারীর হরণ করা কোনো অধিকার নয়, বরং এটি তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দানের একটি ঐশী প্রক্রিয়া। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর এই বিধান মেনে চলার মধ্যেই নিহিত রয়েছে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি। নারীর প্রকৃত মর্যাদা কোনো প্রদর্শনীতে নয়, বরং আল্লাহ প্রদত্ত পর্দার বিধানের মাঝেই সংরক্ষিত।
---
তথ্যসূত্র:
১. আল-কুরআন: সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৯।
২. সহিহ বুখারী: হাদিস নম্বর ৪৭৫৮।
৩. সুনানে তিরমিজি: হাদিস নম্বর ১১৭৩।
৪. তাফসিরে ইবনে কাসীর (আল্লামা ইবনে কাসীর)।

কোন মন্তব্য নেই
A Samam