কুরবানি ইসলামের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করা হয়। কুরবানির সময় শরি...
কুরবানি ইসলামের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করা হয়। কুরবানির সময় শরিক হওয়া বা ভাগে কুরবানি দেওয়া নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন জাগে। বিশেষ করে শরিয়তের বিধান, শরিকদের শর্ত এবং গোশত বন্টন নিয়ে একটি স্পষ্ট নির্দেশিকা নিচে তুলে ধরা হলো।
শরিয়তের বিধান ও হাদিসের প্রমাণ
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, উট, গরু, মহিষ—এই জাতীয় পশুগুলোতে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি বা সাতটি পরিবার শরিক হতে পারে। **সহিহ মুসলিমের** বর্ণনা অনুযায়ী, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, "আমরা হুদাইবিয়ার বছর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে কুরবানি করেছি; উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং গরু সাতজনের পক্ষ থেকে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৩১৮)।
এই বিধানটি সফর (ভ্রমণ) এবং মুকিম (বাড়িতে অবস্থান) উভয় অবস্থার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য।
বিশ্ববিখ্যাত আলেমদের অভিমত
সাত ভাগে কুরবানি দেওয়ার বিষয়ে বিশ্বের বড় বড় মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ একমত পোষণ করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
আল্লামা আব্দুর রহমান মোবারকপুরী (রহ.): প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ এবং 'তুহফাতুল আহওয়াযী'র লেখক।
আল্লামা ওবায়দুল্লাহ মোবারকপুরী (রহ.):'মিরআতুল মাফাতিহ'-এর রচয়িতা।
শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বাজ (রহ.): সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি।
শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহ.): বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ।
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড (লাজনাদ দায়িমাহ): তারা সম্মিলিতভাবে ভাগে কুরবানিকে বৈধ বলে ফতোয়া দিয়েছেন।
শরিকদের মধ্যে গোশত বন্টনের সঠিক নিয়ম
সাত ভাগে কুরবানি দিলে গোশত বন্টনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। শরিয়তসম্মত নিয়মগুলো হলো:
১. ওজন করে বন্টন:** শরিকদের মধ্যে গোশত বন্টনের সময় অবশ্যই পাল্লা দিয়ে ওজন করে সমান ভাগে ভাগ করতে হবে। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কম-বেশি ভাগ করা জায়েজ নেই। যদি কেউ জেনেশুনে বেশি নেয়, তবে সেটি সুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে এবং কুরবানি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
২. পশুর অন্যান্য অংশ:** পশুর হাড়, চর্বি, কলিজা ইত্যাদিও সাত ভাগে সমানভাবে বন্টন করতে হবে।
৩. তিন ভাগে বন্টন (ঐচ্ছিক কিন্তু উত্তম):** কুরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর মোট গোশতকে তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব। এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ অভাবী বা গরিব মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া।
শরিক নির্বাচনের শর্তাবলী
ভাগে কুরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে শরিক নির্বাচনের বিষয়টি সবচেয়ে স্পর্শকাতর।
নিয়তের স্বচ্ছতা:** প্রত্যেক শরিকের উদ্দেশ্য হতে হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। যদি কোনো একজনের উদ্দেশ্য কেবল গোশত খাওয়া বা লোক দেখানো হয়, তবে কারো কুরবানিই কবুল হবে না।
হালাল উপার্জন:** শরিকদের প্রত্যেকের উপার্জন হালাল হতে হবে। যদি কোনো শরিকের অর্থ নিশ্চিতভাবে হারাম হয়, তবে তার সাথে অংশীদার হওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ আল্লাহ কেবল পবিত্র বস্তু ও ইবাদত গ্রহণ করেন।
ঐকমত্য: কুরবানির পশু ক্রয় থেকে শুরু করে বন্টন পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে শরিকদের মধ্যে সুন্দর বোঝাপড়া ও ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন।
উপসংহার
সামর্থ্য থাকলে একটি পূর্ণ পশু কুরবানি করা সর্বোত্তম। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী সাত শরিক পর্যন্ত ভাগ হওয়া সম্পূর্ণরূপে বৈধ। কুরবানির মূল লক্ষ্য হলো 'তাকওয়া'। পশুর রক্ত বা গোশত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল বান্দার আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি।

কোন মন্তব্য নেই
A Samam