ছবি: হাফেজ মুসান্নিফ আব্দুল্লাহ মুসাব্বির মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থানই নয়, বরং এটি মুসলিম সমাজের প্রাণকেন্দ্র এবং হেদায়েতের মিনার। একটি মসজি...
![]() |
| ছবি: হাফেজ মুসান্নিফ আব্দুল্লাহ মুসাব্বির |
মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থানই নয়, বরং এটি মুসলিম সমাজের প্রাণকেন্দ্র এবং হেদায়েতের মিনার। একটি মসজিদ সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন একটি দক্ষ, আমানতদার এবং খোদাভীরু পরিচালনা কমিটি। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মসজিদের কমিটিতে স্থান পাওয়ার ক্ষেত্রে পরহেজগারীর চেয়ে সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বা রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে আল্লাহর ঘর পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট কিছু গুণাবলি থাকা আবশ্যক।
১. পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা: ঈমান ও তাকওয়াই মূল ভিত্তি
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কারা মসজিদের আবাদকারী বা ব্যবস্থাপক হওয়ার যোগ্য। আল্লাহ ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ ۖ فَعَسَىٰ أُولَٰئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
অর্থ: "নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে (ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে), যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং কায়েম করেছে নামাজ ও আদায় করেছে জাকাত; আর আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায় তারা হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।"
(সুরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১৮)
এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মসজিদ কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য প্রধান শর্ত হলো ঈমানদার হওয়া, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি হওয়া এবং একমাত্র আল্লাহকে ভয় করা।
২. সহিহ হাদিসের সতর্কতা: অযোগ্যকে দায়িত্ব প্রদানের পরিণাম
মসজিদ কমিটি গঠন একটি বড় আমানত। অযোগ্য ব্যক্তিকে এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা কিয়ামতের আলামত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সহিহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে:
فَإِذَا ضُيِّعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ. قَالَ: كَيْفَ إِضَاعَتُهَا؟ قَالَ: إِذَا وُسِّدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ
অর্থ: (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন) "যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো। জিজ্ঞেস করা হলো—আমানত কীভাবে নষ্ট হবে? তিনি (সা.) বললেন—যখন কোনো দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।"
(সহিহ বুখারী, হাদিস নম্বর: ৬৪৯৬)
সুতরাং, যার মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান নেই বা যিনি আমানত রক্ষা করতে অক্ষম, তাকে কেবল সামাজিক প্রতিপত্তির কারণে কমিটিতে রাখা শরিয়তসম্মত নয়।
৩. ওলামায়ে কেরাম ও মুজতাহিদ ইমামদের অভিমত
মসজিদ কমিটির সদস্যদের যোগ্যতা সম্পর্কে ইমামগণ অত্যন্ত কঠোর ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি: ফাতাওয়ায়ে শামীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মসজিদের মুতাওয়াল্লী বা কমিটির সদস্যদের অবশ্যই ‘আদিল’ (ন্যায়পরায়ন) এবং ধর্মীয় অনুশাসন পালনকারী হতে হবে। আল্লামা ইবনে আবিদিন শামী (রহ.) লিখেছেন:
"فاسق أو من لا تقوى له لا ينبغي أن يجعل متولياً"
অর্থ: "ফাসেক (প্রকাশ্য পাপাচারী) বা যার মধ্যে তাকওয়া নেই, তাকে মসজিদের মুতাওয়াল্লী বা দায়িত্বশীল বানানো উচিত নয়।"
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার/ফাতাওয়ায়ে শামী, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-৩৮০, মাতলাব ফি শুরতিল মুতাওয়াল্লী)
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.)-এর মতামত: তিনি তার 'আস-সিয়াসা আশ-শারইয়্যাহ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, যে কোনো নেতৃত্বের জন্য দুটি গুণ মৌলিক: 'আল-কুওয়্যাহ' (যোগ্যতা ও শক্তি) এবং 'আল-আমানাহ' (সততা ও আমানতদারি)। মসজিদের মতো পবিত্র স্থানের জন্য আমানতদারি এবং নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়ার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
(সূত্র: আস-সিয়াসা আশ-শারইয়্যাহ ফি ইসলাহির রা'ঈ ওয়ার রায়িয়্যাহ, পৃষ্ঠা-১২-১৫)
৪. মসজিদ কমিটি গঠনের আদর্শ নীতিমালা
উপরিউক্ত দলিলসমূহের আলোকে একজন সাংবাদিক ও আলেম হিসেবে আমরা নিম্নোক্ত নীতিমালা প্রস্তাব করতে পারি:
১. পরহেজগারী: কমিটির প্রতিটি সদস্যকে অবশ্যই নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি হতে হবে। বেনামাজি ব্যক্তির আল্লাহর ঘর পরিচালনার কোনো নৈতিক অধিকার নেই।
২. আমানতদারি: মসজিদের অর্থ ও সম্পদ যেন তছরুপ না হয়, সেজন্য সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মনোনীত করতে হবে।
৩. জ্ঞান ও প্রজ্ঞা: অন্তত কিছু সদস্যকে দ্বীনি মাসআলা-মাসায়েল সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান রাখতে হবে, যাতে তারা ইমাম ও খতিবের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেন।
৪. সেবার মানসিকতা: পদ দখলের লড়াই নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিঃস্বার্থভাবে সময় ও শ্রম দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।
উপসংহার:
মসজিদ কমিটি কোনো রাজনৈতিক ক্লাব বা সামাজিক প্রভাব বিস্তারের জায়গা নয়। এটি মহান আল্লাহর ঘরের খিদমত করার একটি মাধ্যম। তাই কমিটি গঠনের সময় রাজনৈতিক পরিচয় বা ধনাঢ্য হওয়ার চেয়ে ব্যক্তির তাকওয়া ও আমানতদারিকেই প্রধান মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তবেই মসজিদগুলো হেদায়েত ও সমাজ সংস্কারের প্রকৃত কেন্দ্রে পরিণত হবে।

কোন মন্তব্য নেই
A Samam