Page Nav

HIDE

শিরোনাম:

latest

প্রকৃত শহীদ কারা

ইসলামি শরিয়তে ‘শাহাদাত’ একটি অতি উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন পরিভাষা। আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারী মুমিন ব্যক্তিকে ‘শহীদ’ বলা হয়। তবে সাধারণ জনমনে একট...



ইসলামি শরিয়তে ‘শাহাদাত’ একটি অতি উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন পরিভাষা। আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারী মুমিন ব্যক্তিকে ‘শহীদ’ বলা হয়। তবে সাধারণ জনমনে একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলায় নিহত হওয়াই শাহাদাত। কিন্তু কোরআন ও সুন্নাহর গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, শাহাদাতের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। আজ আমরা কোরআন, সুন্নাহ এবং বরেণ্য ওলামায়ে কেরামের মতামতের আলোকে প্রকৃত শহীদদের পরিচয় তুলে ধরব।

১. পবিত্র কোরআনের আলোকপাত

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কোরআনে শহীদদের মৃত্যুঞ্জয়ী ঘোষণা করেছেন। তারা আল্লাহর কাছে জীবিত এবং বিশেষ রিযিকপ্রাপ্ত।

পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে:

وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ

অনুবাদ: "আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত।"

(সুরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৬৯)

২. সহিহ হাদিসের মানদণ্ডে শহীদের প্রকারভেদ

রাসূলুল্লাহ (সা.) শাহাদাতের মর্যাদাকে কেবল যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও শারীরিক বিপদে ধৈর্য ধারণকারী মুমিনদেরও শহীদের মর্যাদা দিয়েছেন।

সহিহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الشُّهَدَاءُ خَمْسَةٌ: الْمَطْعُونُ، وَالْمَبْطُونُ، وَالْغَرِيقُ، وَصَاحِبُ الْهَدْمِ، وَالشَّهِيدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ.

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলাল্লাহ (সা.) বলেছেন, "শহীদ পাঁচ প্রকার: ১. মহামারীতে মৃত ব্যক্তি, ২. পেটের পীড়ায় (কলেরা বা ডায়রিয়া) মৃত ব্যক্তি, ৩. পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি, ৪. চাপা পড়ে (দেয়াল বা ধ্বংসস্তূপের নিচে) মৃত ব্যক্তি এবং ৫. আল্লাহর পথে লড়াই করে নিহত ব্যক্তি।"

(সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ২৮২৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯১৪)

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, নিজের সম্পদ ও পরিবার রক্ষায় নিহত ব্যক্তিও শহীদ।

(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৭৭২)

৩. প্রখ্যাত ওলামা ও মুজতাহিদ ইমামগণের ব্যাখ্যা

ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে শহীদদের শ্রেণিবিন্যাস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ও ফকিহ ইমাম নববী (রহ.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘শারহুল মুসলিম’-এ শহীদদের তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন:

১. দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতের শহীদ: যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি লড়াই করে নিহত হন। এদের জানাজা দেওয়া হলেও গোসল দেওয়া হয় না।

২. কেবল আখেরাতের শহীদ: যারা সরাসরি যুদ্ধে নয়, বরং মহামারীতে, পেটের পীড়ায়, প্রসবকালীন সময়ে বা দুর্ঘটনায় মারা যান। দুনিয়াতে তাদের সাধারণ লাশের মতো গোসল ও কাফন দেওয়া হবে, তবে আখেরাতে তারা শহীদের পূর্ণ সওয়াব পাবেন।

৩. কেবল দুনিয়ার শহীদ: যারা যুদ্ধের ময়দানে নিহত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ছিল গণিমত অর্জন বা বীরত্ব প্রকাশ করা (রিয়া)। তারা দুনিয়াতে শহীদের মর্যাদা পেলেও আল্লাহর কাছে কোনো প্রতিদান পাবে না।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, "শহীদ সেই ব্যক্তি, যাকে কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার কারণে তার ওপর রক্তপণ (দিয়ত) ওয়াজিব হয়নি।"

(তথ্যসূত্র: আল-বাহরুর রায়েক, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-২১০; ফাতাওয়ায়ে শামি)

৪. সাংবাদিকীয় পর্যবেক্ষণ ও উপসংহার

শরীয়তের এই দালিলিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইসলামে শাহাদাত কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং এটি একটি সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অর্জন। তবে শাহাদাতের এই মর্যাদা লাভের পূর্বশর্ত হলো—ব্যক্তিকে অবশ্যই ইমানদার হতে হবে এবং তার উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।

পরিশেষে, বর্তমান সময়ে যারা বিভিন্ন দুর্যোগে বা মজলুম অবস্থায় ইমান রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারান, হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী তারা শাহাদাতের উচ্চ মাকাম পাওয়ার অধিকারী। আল্লাহ আমাদের সকলকে শাহাদাতের তামান্না নিয়ে ঈমানের ওপর অটল থাকার তৌফিক দান করুন।

---

তথ্যসূত্র:

১. আল-কোরআন: সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১৬৯।

২. সহিহ বুখারী: হাদিস নং ২৮২৯।

৩. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ১৯১৪।

৪. শারহু সহিহ মুসলিম (ইমাম নববী): খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৬৩।

৫. রদ্দুল মুখতার/ফাতাওয়ায়ে শামি (ইবনে আবিদিন শামি)।

কোন মন্তব্য নেই

A Samam