বিড়াল পালন: ইসলামি শরিয়াহর আলোকে ১০টি বিশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব বিশেষ প্রতিবেদন | ইসলামি ডেস্ক মানবজাতির কল্যাণে মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে অ...
বিড়াল পালন: ইসলামি শরিয়াহর আলোকে ১০টি বিশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব
বিশেষ প্রতিবেদন | ইসলামি ডেস্ক
মানবজাতির কল্যাণে মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে অসংখ্য জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে বিড়াল এমন একটি প্রাণী যা যুগ যুগ ধরে মানুষের খুব কাছাকাছি বসবাস করে আসছে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিড়াল পালন কেবল একটি শখ নয়, বরং এটি দয়া ও সওয়াব অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। নিম্নে কোরআন, সুন্নাহ এবং ওলামায়ে কেরামের মতামতের ভিত্তিতে বিড়াল পালনের ১০টি ফজিলত ও গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:
১. সৃষ্টির প্রতি দয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন:
বিড়ালসহ যেকোনো প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
وَمَا مِن دَآبَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُم
অর্থ: "আর পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণী আছে এবং ডানা দিয়ে উড়ে এমন যত পাখি আছে, তারা সবাই তোমাদের মতো এক একটি উম্মত বা জাতি।" (সূরা আল-আন’আম, আয়াত: ৩৮)।
২. বিড়ালের পবিত্রতা ও ইবাদতে বাধা না হওয়া:
বিড়াল একটি পবিত্র প্রাণী। এর উচ্ছিষ্ট বা লালা নাপাক নয়। এ সম্পর্কে নবীজি (সা.) এর অকাট্য হাদিস রয়েছে:
إِنَّهَا لَيْسَتْ بِنَجَسٍ، إِنَّمَا هِيَ مِنَ الطَّوَّافِينَ عَلَيْكُمْ وَالطَّوَّافَاتِ
অর্থ: "এটি (বিড়াল) অপবিত্র নয়; বরং এটি তোমাদের আশেপাশে অধিক বিচরণকারী বা বিচরণকারিনী।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৭৫; জামে তিরমিজি, হাদিস নং: ৯২)।
৩. পরকালে মুক্তির উসিলা:
বিড়ালের প্রতি সদয় হওয়া জান্নাতে যাওয়ার কারণ হতে পারে। সহিহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, একজন পাপাচারী নারী একটি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে জান্নাতি হয়েছিলেন। ওলামায়ে কেরামের মতে, বিড়ালের ক্ষেত্রেও একই হুকুম প্রযোজ্য।
কিতাব: ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)।
৪. বিড়াল পালনকারীদের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের সুন্নাহ:
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বিড়াল অত্যন্ত পছন্দ করতেন। তার নাম ‘আবু হুরায়রা’ (বিড়ালের পিতা) হওয়ার কারণ ছিল তার বিড়াল প্রীতি।
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, "আবু হুরায়রা (রা.) এর এই উপাধি এবং বিড়াল প্রেম প্রমাণ করে যে, বিড়াল পালন ও তাদের প্রতি যত্নশীল হওয়া ইসলামের একটি প্রশংসনীয় দিক।"
কিতাব: আল-ইসাবাহ ফি তাময়ীযিস সাহাবাহ।
৫. ঘরের বরকত ও অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা:
বিড়াল ঘরে থাকলে ইঁদুর বা ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এটি পরোক্ষভাবে মানুষের খাদ্যদ্রব্য ও পরিবেশকে সুরক্ষা দেয়। ফিকহ শাস্ত্রের ইমামগণ বিড়ালকে 'ঘরের অংশ' হিসেবে গণ্য করেছেন।
৬. রিজিকে বরকত ও সদকার সওয়াব:
বিড়ালকে খাবার ও পানি দেওয়া এক প্রকার সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرٌ
অর্থ: "প্রত্যেক প্রাণীর (যাদের কলিজা তাজা আছে) সেবার মধ্যে সওয়াব রয়েছে।" (সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ২৩৬৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২২৪৪)।
৭. বিড়াল হত্যার কঠোর হুঁশিয়ারি থেকে বাঁচা:
বিড়াল পালন করা যেমন সওয়াবের, একে কষ্ট দেওয়া তেমনি গুনাহের। রাসূল (সা.) একটি বিড়ালকে আটকে রেখে মেরে ফেলার কারণে এক মহিলার জাহান্নামে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২২৪২)। সুতরাং বিড়াল লালন-পালন করলে এই কঠোর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকা এবং প্রাণিকুলের প্রতি হকের হেফাজত করা সম্ভব হয়।
৮. বিড়ালের ঝুটা খাবারের বিধান:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে, বিড়ালের মুখ দেওয়া পানি বা খাবার নাপাক নয়। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন, "বিড়ালের উচ্ছিষ্ট পবিত্র, তা দিয়ে ওজু করাও বৈধ।"
কিতাব: আল-মাজমু' শারহুল মুহাযযাব (ইমাম নববী)।
৯. একাকীত্ব দূরীকরণ ও মানসিক প্রশান্তি:
বিড়াল মানুষের একাকীত্ব দূর করে। প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম ও আধ্যাত্মিক সাধকগণ অনেক সময় বিড়ালের সঙ্গকে নির্জনবাস বা ইবাদতের সহায়ক মনে করতেন। এটি মানুষের মনে কোমলতা সৃষ্টি করে।
১০. ইসলামি ঐতিহ্যে বিড়ালের বিশেষ স্থান:
বিখ্যাত মুজতাহিদ ইমামদের মতে, বিড়াল লালন-পালন করা জায়েজ এবং এটি গৃহপালিত পশুর অন্তর্ভুক্ত। ইমাম মালিক (রহ.) বিড়ালের উচ্ছিষ্টকে মাকরূহও মনে করতেন না।
কিতাব: মুওয়াত্তা ইমাম মালিক।
উপসংহার:
বিড়াল পালন কেবল শখের বিষয় নয়, বরং এটি দয়া, মায়া এবং দায়িত্বশীলতার বহিঃপ্রকাশ। তবে শর্ত হলো, বিড়ালের প্রয়োজনীয় খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনোভাবেই তাকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। ইসলামি শরিয়তের এই উদারতা প্রমাণ করে যে, ইসলাম কেবল মানুষের নয়, বরং জগতের সকল প্রাণীর অধিকার নিশ্চিত করে।
তথ্যসূত্র:
১. আল-কুরআন (সূরা আল-আন’আম)।
২. সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম।
৩. সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিজি।
৪. ফাতহুল বারী (ইবনে হাজার আসকালানী)।
৫. আল-মাজমু' (ইমাম নববী)।

কোন মন্তব্য নেই
A Samam